ক্রমেই যেন আস্থার প্রতীক হয়ে উঠেছেন বিএনপি চেয়ারপারসন বেগম খালেদা জিয়া। তাঁর ফিরে আসার অপেক্ষায় সারাদেশ যেন একাট্টা। সরকারি-বেসরকারি থেকে শুরু করে বিদেশী বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকদের তত্বাবধানে বেগম জিয়ার চিকিৎসা চলছে। নানাবিধ জটিল রোগে আক্রান্ত তিনি। দোয়া-প্রার্থনা করা হচ্ছে সারাদেশে। দেশবাসী তাঁর সুস্থ হয়ে ফিরে আসার অপেক্ষায় উন্মূখ।
আশি (৮০) বছর বয়সী প্রবীণ রাজনীতিবিদ ও সাবেক তিনবারের প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়া দীর্ঘদিন ধরে হৃদ্রোগ, ডায়াবেটিস, আর্থ্রাইটিস, লিভার সিরোসিস, কিডনির জটিলতাসহ নানা শারীরিক জটিলতায় ভুগছেন। গত রোববার তীব্র শ্বাসকষ্ট দেখা দিলে জরুরি অবস্থায় তাঁকে রাজধানীর এভারকেয়ার হাসপাতালে নেওয়া হয়। বর্তমানে তিনি হাসপাতালের করোনারি কেয়ার ইউনিটে (সিসিইউ) রয়েছেন। গুরুতর অসুস্থ খালেদা জিয়া গত বুধবার থেকে প্রায় সাড়াহীন ছিলেন। তিন দিন পর গতকাল শনিবার তিনি চিকিৎসকদের সঙ্গে কথা বলেছেন। হাসপাতাল সুত্র জানায়, খালেদা জিয়ার শারীরিক অবস্থা গত বুধ, বৃহস্পতি ও শুক্রবারের চেয়ে শনিবারে সামান্য উন্নতি দেখা গেছে। কিন্ত সামগ্রিক সংকট কাটেনি। বিশেষত কিডনির কার্যকারিতা মারাত্মকভাবে কমে যাওয়ায় তাঁকে টানা চার দিন ডায়ালাইসিস করতে হয়েছে।
বেগম খালেদা জিয়ার স্বাস্থ্য পরিস্থিতি নিয়ে বিএনপি এক জরুরি বৈঠকশেষে সংবাদ সম্মেলনে দলীয় চেয়ারপার্সনের ব্যক্তিগত চিকিৎসক ও বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য অধ্যাপক ডা. এ জেড এম জাহিদ হোসেন বলেন, খালেদা জিয়াকে বিদেশে নেওয়ার বিষয়টি তার শারীরিক অবস্থা এবং মেডিক্যাল বোর্ডের সিদ্ধান্তের উপর নির্ভর করছে।
তিনি এ সময় আরও জানান, দেশি-বিদেশি বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকদের পরামর্শে বিএনপি চেয়ারপার্সন ও সাবেক প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়াকে উন্নত চিকিৎসার জন্য দেশের বাইরে নিয়ে যাওয়ার সিদ্ধান্ত হলে তা দেশবাসীকে জানানো হবে।
জিয়া অরফানেজ ট্রাস্ট দুর্নীতি মামলায় বেগম খালেদা জিয়া কারান্তরীণ থাকা অবস্থায় অসুস্থ হয়ে পড়েন। এসময় তাকে কারা কর্তৃপক্ষের তত্বাবধানে বারবার চিকিৎসার ব্যবস্থা করা হলেও সেই চিকিৎসা যথোপযুক্ত হয়নি দাবী করে বিএনপি অভিযোগ তুলেছিল। দলটির পক্ষ থেকে বেগম জিয়াকে পেরোলে মুক্তি দিয়ে উন্নত চিকিৎসার জন্য বিদেশে পাঠানোর দাবী তোলা হয়। কিন্ত বিগত সরকার বরাবরই তা অগ্রাহ্য করেন। গত ৫ আগস্ট গণঅভ্যুত্থানে আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর বেগম জিয়া কারামুক্ত হন। পরবর্তীতে তার বিরুদ্ধে চলমান মামলাগুলো রাজনৈতিক বিবেচনায় তাঁকে অব্যাহতি দেয়া হয়। এরপর তার বিদেশে উন্নত চিকিৎসার পথ উন্মূক্ত হয়।
চলতি বছরের রোজার আগেই কাতার আমীরের দেয়া একটি বিশেষ বিমানে করে তাঁকে লন্ডনে নিয়ে যাওয়া হয়। সেখানে দীর্ঘদিন নির্বাসনে থাকা জৈষ্ঠপুত্র ও বিএনপি‘র ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমান এবং পরিবারের অন্য সদস্যদের সান্নিধ্যে লন্ডন হাসপাতালে চিকিৎসা নেন তিনি। এসময় বেগম জিয়ার ব্যক্তিগত চিকিৎসক ও বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য অধ্যাপক ডা. এ জেড এম জাহিদ হোসেনসহ বাংলাদেশ থেকে ৮ সদস্যের প্রতিনিধিদল প্রায় ২ মাস তাঁর চিকিৎসার যাবতীয় পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করেন ও বিভিন্ন সময়ে তা দেশবাসীকে অবগত করেন। পরে বেগম জিয়া অনেকটা সুস্থ হয়েই দেশে ফেরেন। তাঁর এই ফিরে আসা কেন্দ্র থেকে তৃণমুল পর্যন্ত দলের নেতাকর্মীদের ভীষণভাবে অনুপ্রাণিত করে তোলে। একইসঙ্গে সারাদেশে ছড়িয়ে থাকা অগণিত ভক্ত-শুভাকাঙ্খীসহ দেশবাসীর মধ্যেও স্বস্তি ফিরিয়ে আনে।
দেশে ফিরে আসার কয়েক সপ্তাহ পর থেকেই বেগম জিয়া বেশ কয়েকবার নানাবিধ স্বাস্থ্য সম্পর্কিত জটিলতা নিয়ে হাসপাতালে চিকিৎসা নেন। তারপরও তাঁর শারিরীক সুস্থতা নিয়ে অনিশ্চয়তা কাটেনি। এরই মধ্যে দেশে ৫ আগস্ট পরবর্তী অন্তর্বর্তী সরকারের কাছে একটি সুষ্ঠ নির্বাচন অনুষ্ঠানের দাবীতে রাজনৈতিক অঙ্গন সোচ্চার হয়ে উঠে। অন্তর্বর্তী সরকারও আসছে ফেব্রুয়ারীর প্রথমভাগে ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন অনুষ্ঠনের লক্ষ্যে প্রস্তুতির অগ্রগতির কথা জানিয়েছে। অধিকাংশ রাজনৈতিক দলও এখন মাঠে। এদিকে, দলের ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমান অদ্যাবধি নির্বাসনে থাকায় দলের গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত ও কৌশল প্রনয়নে বেগম জিয়াকে সংশ্লিষ্ট হতে হয়েছে। কিন্ত চিকিৎসা সংক্রান্ত বিশেষজ্ঞ পরামর্শ থাকায় তিনি সশরীরে তেমনভাবে কোনও সভায় উপস্থিত থাকতে পারেননি। বিভিন্ন সময়ে তাকেঁ ভার্চুয়ালি দলীয় নীতি-নির্ধারণী সভায় যুক্ত থাকতে দেখা গেছে। যদিও গত ৩ নভেম্বর বিএনপি ঘোষিত সম্ভাব্য প্রার্থী তালিকায় বেগম জিয়ার জন্য ৩টি আসনে নির্বাচন করার কথা দেশবাসীকে জানানো হয়েছে।
নির্বাচনের সময় যত ঘনিয়ে আসছে ঠিক এই সময়ে বেগম জিয়ার শারিরীক অবস্থার দ্রুত অবনতি ঘটে। তীব্র শ্বাসকষ্ট দেখা দিলে জরুরি অবস্থায় গত রোববার তাঁকে রাজধানীর এভারকেয়ার হাসপাতালে নেওয়া হয়। বর্তমানে তিনি হাসপাতালের করোনারি কেয়ার ইউনিটে (সিসিইউ) রয়েছেন।
দলের নেতাকর্মীদের ধারনা, বিগত আওয়ামী লীগ সরকারের সময়ে দীর্ঘসময় কারগারে থাকা ও চিকিৎসা গাফিলতির কারনে বেগম খালেদা জিয়ার আজকের এই পরিণতি। সময়মতো সঠিক চিকিৎসার সুব্যবস্থা করা গেলে তিনি হয়তো এতোটা অসুস্থ ও শারিরীকভাবে দুর্বল হয়ে পড়তেন না।
শহীদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমানের সহধর্মীনি বেগম খালেদা জিয়া রাজনীতিতে আসেন ১৯৮২ সালের ৩ জানুয়ারি। তার আগের বছর ১৯৮১ সালের ৩০ মে তাঁর স্বামী জিয়াউর রহমান এক সেনা অভ্যুত্থানে নিহত হন। পরের বছরই তিনি দলটির সিনিয়র ভাইস চেয়ারম্যান এবং ১৯৮৪ সালে বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় চেয়ারপারসন নির্বাচিত হন। তার নেতৃত্বেই বিএনপি একটি গণমানুষের দল হিসেবে পূর্ণতা পায়।
১৯৮৩ থেকে ১৯৯০ সাল পর্যন্ত স্বৈরশাসক প্রয়াত এরশাদ বিরোধী আন্দোলনে নেতৃত্ব দিয়ে ‘আপসহীন নেত্রী’ হিসেবে জনগণের কাছে আস্থা ও গ্রহণযোগ্যতা অর্জন করেন বেগম খালেদা জিয়া। গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠার লড়াইয়ে তার অসামান্য ভূমিকা দেশের রাজনৈতিক ইতিহাসের একটি বড় অধ্যায়। ফলশ্রিুতিতে ১৯৯১, ২০০১ ও ২০০৬ সালের নির্বাচনে পাঁচটি সংসদীয় আসন থেকে নির্বাচিত হয়ে তিনি দেশের প্রধানমন্ত্রী হন। ২০০৭ সালে সেনা সমর্থিত সরকার আসলে তাঁকে এক বছরের বেশি সময় কারাগারে অন্তরীণ রাখা হয়। ২০০৮ সালের নির্বাচনে তিনটি আসনে বেগম খালেদা জিয়া একাই জিতেছিলেন। ফোর্বস ম্যাগাজিনের বিশ্বের ১০০ ক্ষমতাবান নারীর তালিকায় তিনি ছিলেন ২০০৪ সালে ১৪তম, ২০০৫ সালে ২৯তম এবং ২০০৬ সালে ৩৩তম।
গণতান্ত্রিক আন্দোলন ও রাজনৈতিক প্রতিহিংসার বিভিন্ন পর্যায়ে তাকে মোট পাঁচবার গ্রেফতার হতে হয়। প্রথমবার ১৯৮৩ সালে, এরপর ১৯৮৪ ও ১৯৮৭, ২০০৭ সালে সেনাসমর্থিত সরকারের সময়ে এবং ২০১৮ সালে শেখ হাসিনা সরকারের আমলে। এরপর ২০১৮ সালে দুর্নীতির মামলায় কারাগারে পাঠানো হলে প্রায় দু’ বছরের বেশি সময় কারাগারে থাকার পর ২০২০ সালের ২৫ মার্চ শর্তসাপেক্ষে মুক্তি দেয়া হয়। কিন্ত পরে তাঁকে আবারো কারাগারে প্রেরণ করা হয়।
তাঁর অসুস্থতায় এখন পুরো জাতি যেনো এক হয়ে সৃষ্টিকর্তার নিকট তাঁর সুস্থতা কামনায় দোয়া ও প্রার্থনা করছেন। এ লক্ষ্যে গেলো শুক্রবার সারাদেশে মসজিদে মসজিদে বিশেষ দোয়া করা হয়। গত শনিবার অন্তর্বর্তী সরকারের উপদেষ্টা পরিষদে অনির্ধারিত বৈঠকে প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনুস দেশবাসীর প্রতি বেগম জিয়ার জন্য দোয়া করার আহবান জানান।
গতকাল রোববার তাঁর স্বাস্থ্যের সর্বশেষ পরিস্থিতির খবর নিতে হাসপাতালে ছুটে গিয়েছিলেন দেশের শীর্ষ রাজনৈতিক ব্যাক্তিরা। হাসপাতালের বাইরে অপেক্ষমাণ আছেন দলের শত শত নেতা-কর্মী। দলের চেয়ারপারসনের এই সংকটাপন্ন সময়ে কেউ কেউ কান্নায়ও ভেঙে পড়ছেন। সকলেরই প্রত্যাশা বেগম খালেদা জিয়া ফিরে আসবেন। উদ্বিগ্ন অনেকেই কৌতুহল নিয়ে একে অপরকে প্রশ্ন করছেন বেগম জিয়া ফিরবেন কি? আবারো কি হাল ধরবেন দল ও দেশের !
নয়াশতাব্দী/এনএ