চব্বিশের গণঅভ্যুত্থানের পর নানা চড়াই-উৎরাই পেরিয়ে নির্বাচন যতই ঘনিয়ে আসছে রাজনৈতিক মতবিরোধ ও সংঘাতে প্রাণহানির ঘটনা ততই যেনো বাড়ছে। গত দুই মাসের পরিসংখ্যান তুলনায় ধরলে দেখা যায় নভেম্বর মাসে দেশে রাজনৈতিক সহিংসতা অক্টোবরের তুলনায় বেড়েছে। অক্টোবরে ৪৯টি সহিংসতার ঘটনায় ৫৪৭ জন আহত ও ২ জন নিহত হয়েছিলেন। পরের মাস নভেম্বরে ৭২টি রাজনৈতিক সহিংসতায় ৭২৪ জন আহত হয়েছেন আর নিহত হয়েছেন ৯ জন। সেই হিসাবে গত মাসের চেয়ে নভেম্বরে রাজনৈতিক সহিসংতায় নিহতের সংখ্যা সাতজন বেড়েছে। পুলিশের উদ্ধৃতি দিয়ে গণমাধ্যমে প্রকাশিত তথ্যে নিহত ও আহতের এই সংখ্যা জানিয়েছে একটি মানবাধিকার সংগঠন।

২০২৪ সালের সেপ্টেম্বর থেকে ২০২৫ সালের সেপ্টেম্বর পর্যন্ত ১৩ মাসে সারাদেশে ১ হাজার ৪৭টি রাজনৈতিক সংঘর্ষ নথিভুক্ত করা হয়েছে। এসব সংঘর্ষে অন্তত ১৬০ জন নিহত এবং ৮ হাজার ৫০ জন আহত হয়েছেন বলে মানবাধিকার সংস্থা হিউম্যান রাইটস্ সাপোর্ট সোসাইটি (এইচআরএসএস)। সংস্থাটির প্রতিবেদনে সতর্ক করে বলা হয়েছে, আইনশৃঙ্খলা অবনতির এই ধারা অব্যাহত থাকলে সাধারণ জনগণ নিরাপত্তাহীনতায় ভুগবে।

এইচআরএসএস এর প্রতিবেদনে দলভিত্তিক নিহত ও আহতের পরিসংখ্যান থেকে জানা যায়, ১৩ মাসের রাজনৈতিক সংঘাতে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দলের (বিএনপি) ১০৪ জন নিহত এবং ৫ হাজার ৩৩৭ জন আহত হয়েছে। কার্যক্রম নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগের ৩৮ জন নিহত ও ১ হাজার ১৪১ জন আহত হয়েছে। এর বাইরে অন্যান্য দল ও গোষ্ঠীর ১৮ জন নিহত ও ৫৭২ জন আহত হয়েছে।

সর্বশেষ গত রোববার দিনেদুপুরে খুলনা জেলা জজ কোর্টের সামনের সড়কে হাজিরা দিয়ে চলে যাওয়ার সময় ২ ব্যক্তিকে গুলি করে ও কুপিয়ে হত্যা করা হয়। নিহতরা অস্ত্র মামলার হজিরা দিতে আদালতে এসেছিলেন। ঘটনাস্থলেই একজন নিহত হন, অন্যজন হাসপাতালে নেয়ার পর মারা যান। এলাকায় আধিপত্য বিস্তারকে কেন্দ্র করে বিবদমান দুই সন্ত্রাসী গ্রুপের কোন্দলে ওই হত্যাকান্ড ঘটে বলে পুলিশ জানিয়েছে। স্থানীয় একাধিক সুত্র জানায়, হামলায় অংশ নেয়া এবং হামলার শিকার ব্যাক্তিদের রাজনৈতিক সংশ্লিষ্টতা প্রকাশ্যে না এলেও তাদের পেছনে রাজনৈতিক শক্তি রয়েছে। গত বছরের ৫ আগস্টের পর দেশে বেড়েছে রাজনৈতিক সহিংসতায় মৃত্যুর ঘটনা।

এইচআরএসএস এর প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, সবচেয়ে বেশি সহিংসতা ঘটেছে বিএনপির অভ্যন্তরীণ কোন্দলে। এছাড়া বিএনপি-আওয়ামী লীগের সংঘর্ষের ঘটনায়ও কমপক্ষে ৩৪ জন নিহত হয়েছেন। বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, দেশের রাজনৈতিক দলগুলোতে সহিংসতা নিয়ন্ত্রণের কোনো স্থায়ী ব্যবস্থা নেই। ক্ষমতার দাপট প্রদর্শন করে প্রভাব সৃষ্টি ও চাঁদাবাজি এর মুল কারণ।

সম্প্রতি গণমাধ্যমে স্বরাষ্ট্র উপদেষ্টা লেফটেন্যান্ট জেনারেল (অব.) মো. জাহাঙ্গীর আলম চৌধুরী জোর দাবি করে বলেছেন, “দেশে আইনশৃঙ্খলার কোনো বড় ধরনের অবনতি হয়নি। যেসব ঘটনাকে কেন্দ্র করে আলোচনা বাড়ছে সেগুলো দ্রুতই নিয়ন্ত্রণে এসেছে। আমরা খুব সতর্ক আছি।”

রাজনৈতিক সহিংসতা থেকে সৃষ্ট সামাজিক অস্থিরতা এবং জেলা-উপজেলা পর্যায়ে সংঘাত-সংঘর্ষের চিত্র সম্পর্কিত এক প্রশ্নের জবাবে স্বরাষ্ট্র উপদেষ্টা অবশ্য বলেছেন যে, আইনশৃঙ্খলা বাহিনী “জিরো টলারেন্স (শূন্য সহনশীলতার নীতি)” অনুসরণ করছে এবং যেকোনো অস্থিতিশীলতাকে কঠোরভাবে প্রতিহত করা হবে।

স্বরাষ্ট্র উপদেষ্টার এই দাবিকে অন্তঃসারশুন্য উল্লেখ করে বিশ্লেষকরা বলেছেন, সাম্প্রতিক হত্যাকাণ্ডগুলো শুধু আইনশৃঙ্খলার ব্যর্থতার পরিচায়ক নয়, বরং সরকারের রাজনৈতিক নীতি ও দুর্বল প্রশাসনিক ব্যবস্থা নিয়েও প্রশ্ন তোলে।

মাওলানা ভাসানী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্রিমিনোলজি অ্যান্ড পুলিশ সায়েন্স বিভাগের চেয়ারম্যান অধ্যাপক ড. ওমর ফারুক দৈনিক নয়া শতাব্দীকে বলেন, “খুলনার ঘটনা স্বাভাবিক নয়। আদালত প্রাঙ্গণে মানুষ ন্যায়বিচারের জন্য যায়। সেখানে প্রাণনাশের ঘটনা ঘটলে রাষ্ট্রীয় আইনশৃঙ্খলা কাঠামোকে পুনর্বিবেচনা করা জরুরি। গত ১৫ মাস ধরে আমরা দেখতে পাচ্ছি, আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নাজুক। দেশের নিরাপত্তা ব্যবস্থা কার্যকর নয়। দুর্বল সরকার ব্যবস্থার ফল হচ্ছে আজকের নৈরাজ্য। জনজীবন বিপন্ন, অপরাধ বৃদ্ধি পাচ্ছে। রাষ্ট্র যদি শাস্তি নিশ্চিত করতে না পারে, তাহলে সাধারণ মানুষ আতঙ্কে ভুগবে।”

অধ্যাপক উমর ফারুক মনে করেন, দুর্বল সরকার ব্যবস্থা ও প্রশাসনের সঙ্গতিহীন পদক্ষেপ সাম্প্রতিক নৈরাজ্যের মূল কারণ। তিনি বলেন, নাগরিক নিরাপত্তা, আইনশৃঙ্খলা ও সামাজিক স্থিতিশীলতা নিশ্চিত করতে সরকারের সক্রিয় ও শক্তিশালী পদক্ষেপ অপরিহার্য।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শান্তি ও সংঘর্ষ অধ্যয়ন বিভাগের সহযোগি অধ্যাপক সাজ্জাদ হোসেন সিদ্দিকী দৈনিক নয়া শতাব্দীকে বলেন, ”ধর্মীয় বা গণতান্ত্রিক সব দলগুলোই অন্ধকারের দিকে যাত্রা করেছে।  আমার ধারণা বেশ কয়েকটি গোষ্ঠী দেশকে পরিকল্পিতভাবে নৈরাজ্যকর করার চেষ্টা কর চালাচ্ছে। তারা চাইছে না দেশের রাজনৈতিক পরিস্থিতি স্বাভাবিক হোক।”

সাজ্জাদ সিদ্দিকী বলেন, আমি বিষয়টা একটু ভিন্নভাবেও দেখি। সহিংসতা যে পরিমানে হওয়ার কথা ছিল সেভাবে হয়নি। অর্থাৎ আমি বলবো যেভাবে সহিংসতা বাড়ার কথা ছিল সেভাবে কিন্তু বাড়েনি। একটি গণতান্ত্রিক দেশে সচরাচর দুটি প্রধান রাজনৈতিক দল থাকে। বাংলাদেশে বিশেষ প্রেক্ষাপটে ৫ আগস্টের পর একটি রাজনৈতিক দলের কার্যক্রম নিষিদ্ধ হয়ে গেছে। সব পক্ষ মিলে সেই রাজনৈতিক দলটির চরিত্র হননে ব্যাস্ত। এমন প্রেক্ষাপটে যেভাবে খুন খারাপি মারামারি হওয়ার কথা ছিল সেভাবে কিন্তু হয় নি।"

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজকল্যান ও গবেষণা ইনস্টিটিউটের সহযোগী অধ্যাপক এবং সমাজ ও অপরাধ বিশেষজ্ঞ ড. তৌহিদুল হক দৈনিক নয়া শতাব্দীকে বলেন, “যদি রাজনৈতিক সহিংসতা থামানো না যায়, রাষ্ট্রীয় শৃঙ্খলা ভেঙে পড়ার সম্ভাবনা রয়েছে। মূল সমস্যা এসব সমস্যা সমাধানে রাজনৈতিক দল ও প্রশাসনের পারস্পরিক অসঙ্গতিপূর্ণ ভূমিকা। রাজনৈতিক দলগুলো নেতাকর্মীর স্বার্থে ব্যবস্থা নেন, ফলে সাধারণ নাগরিকের নিরাপত্তা সবসময় ক্ষতিগ্রস্ত হয়। পুলিশও রাজনৈতিক ঘটনার মোকাবেলায় দ্বিধাগ্রস্ত থাকে। কখনো কখনো রাজনীতিকদের চাপের কারণে প্রশাসন সিদ্ধান্ত নিতে এক অনিশ্চিত হুমকি বোধ করে।”

ড. হক আরও বলেন, “৫ অগাস্টের পর থানা থেকে লুট হওয়া অস্ত্র সন্ত্রাসীদের হাতে চলে গেছে। যা উদ্ধার করতে ব্যর্থ হয়েছে সরকার। পুলিশ অনেকটাই ভেঙে পড়েছিল। তারপরও তারা বেকায়দায় না পড়ার মনোভাব নিয়েই কাজ করছে। সামনে নির্বাচন আসছে। এই মুহূর্তে নাগরিকদের চাওয়া এক সংঘাতহীন দেশ। সরকার যদি কার্যকর পদক্ষেপ না নেয়, সামাজিক ও অর্থনৈতিক ক্ষেত্রে বিরূপ প্রভাব পড়বে।”

তিনি বলেন, “রাজনীতিকরা যদি তাদের প্রতিশ্রুত কর্মকাণ্ডে ব্যর্থ হন, এবং প্রশাসন রাজনৈতিক চাপের মুখে সিদ্ধান্ত নিতে না পারে, তাহলে সাধারণ মানুষই ভোগান্তিতে পড়ে। এই পরিস্থিতি সামাজিক ও অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডকে ব্যাহত করছে। এরও একটা প্রতিফলন এসব সহিংসতা।”

এইচআরএসএস প্রতিবেদনে বলা হয়, দেশে রাজনৈতিক সংঘর্ষের সংখ্যা প্রতি মাসে প্রায় ৮০ থেকে ৯০টি। এসব সংঘর্ষে সাধারণ মানুষই সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়। সংস্থাটির নির্বাহি পরিচালক মোঃ জিয়াউর রহমান বলেন, “রাষ্ট্র যদি কার্যকর পদক্ষেপ না নেয়, সংঘর্ষের মাত্রা আরও বাড়বে। মানুষ নিরাপত্তাহীনতায় ভুগবে। এটি পুরো জাতির জন্য ঝুঁকিপূর্ণ।”

নয়াশতাব্দী/এসআর