পুরান ঢাকার লক্ষ্মীবাজারে অবস্থিত সম্রাট বাহাদুর শাহ জাফর পার্ক। স্থানীয়দের কাছে পার্কটি পরিচিত ‘আন্টাঘর’ নামে। আবার অনেকের কাছে এটি ভিক্টোরিয়া পার্ক নামেও পরিচিত। একসময় গাছের ডাল কেঁপে উঠত ফাঁসিতে ঝুলে থাকা সিপাহিদের দেহের ভারে, বাতাসে ভাসত রক্তাক্ত ইতিহাসের আতঙ্ক। অথচ ইতিহাসের সেই রক্তাক্ত স্মৃতিকে বুকে নিয়ে উদ্যানটি আজ পরিণত হয়েছে শহরের মানুষের হাঁটার পথ, তরুণদের আড্ডার জায়গা আর বিনোদনের কেন্দ্রে।

 

এটি  শুধু একটি বিনোদনের স্থান নয়; এটি ইতিহাসের এক জীবন্ত সাক্ষী। আজকের দিনে মানুষ এখানে আসে অবসর কাটাতে, শারীরিক ব্যায়াম করতে, অথবা প্রেমিক-প্রেমিকার গল্প বুনতে। কিন্তু দুঃখজনক সত্য হলো, অধিকাংশ মানুষ জানে না পার্কটির পেছনে লুকিয়ে আছে বাংলাদেশের ও ভারতের ইতিহাসের এক চিরন্তন অধ্যায়।

 

নানা সময়ে এই পার্কটির নাম পরিবর্তন হয়েছে। আর নাম পরিবর্তনের পেছনে রয়েছে নানান ইতিহাস। ওই সময়কার শাসকদের বিনোদন, সংস্কৃতি, শক্তি প্রদর্শন, বিদ্রোহ, প্রতিরোধ, জাতীয়তাবাদী চেতনা লুকিয়ে আছে প্রতিটি নামের পিছনে।  

 

আঠারো শতকের শেষের দিকে ঢাকার আর্মেনীয় সম্প্রদায় এখানে একটি বিলিয়ার্ড ক্লাব প্রতিষ্ঠা করে। স্থানীয়রা বিলিয়ার্ড বলকে ‘আণ্টা’ বলত। এথেকেই জায়গাটির নাম হয় ‘আণ্টাঘর’। ঢাকার নবাব আবদুল গণি ও নবাব আহসান উল্লাহর পৃষ্ঠপোষকতায় এখানে বিলিয়ার্ড, টেনিস, ব্যাডমিন্টন খেলা হতো। আড্ডা, পার্টি ও বিনোদনের কেন্দ্র হয়ে ওঠে স্থানটি।

 

নবাব খাজা আহসানুল্লাহর ছেলে খাজা হাফিজুল্লাহর অকালমৃত্যুর পর ইংরেজরা তাঁর স্মরণে ১৮৮৪ সালে পার্কে একটি স্মৃতিস্তম্ভ নির্মাণ করে। ১৮৫৮ সালে রানি ভিক্টোরিয়ার শাসনভার গ্রহণের ঘোষণা এখান থেকেই পাঠ করা হয়। তখন এর নাম দেওয়া হয় ‘ভিক্টোরিয়া পার্ক’। পার্ক ঘিরে লোহার রেলিং বসানো হয়, চারপাশে রাখা হয় কামান। নবাব পরিবারের অর্থায়নে উন্নয়ন কাজ হয়।  

 

১৮৫৭ সালে মোঘল সম্রাট দ্বিতীয় বাহাদুর শাহের আমলে সংঘটিত সিপাহী বিদ্রোহ এ জায়গাটিকে নতুন ইতিহাস দেয়। একই বছরের ২২ নভেম্বর লালবাগ কেল্লায় ইংরেজ মেরিন সেনারা হামলা চালায়। তাদের বিরুদ্ধে গর্জে ওঠেন  দেশীয় সেনারা। প্রতিরোধ গড়ে তুললে যুদ্ধ বেঁধে যায়।তবে যুদ্ধ শেষে পরাজিত হয় দেশিয় সেনারা। ইংরেজ সেনারা এসময়  ১১ জন বিদ্রোহী সিপাহীকে আটক করে। প্রহসনমূলক বিচার শেষে তাদের দোষী সাব্যস্ত করে মৃত্যুদণ্ড দেয়া হয়। ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক শাসনের নির্মম ইতিহাসের সাক্ষী এই স্থানেই এক প্রহসনমূলক বিচারের মাধ্যমে অসংখ্য বিপ্লবী সিপাহিকে ফাঁসিতে ঝুলিয়ে হত্যা করা হয়েছিল। সেইসাথে বিদ্রোহ দমনে আতঙ্ক সৃষ্টির জন্য তাদের মরদেহ দীর্ঘদিন গাছে ঝুলিয়ে রাখা হয়। ফলে এলাকা জুড়ে ছড়িয়ে পড়ে ভয় ও আতঙ্ক। জনগণকে ভয় দেখাতে তাদের মরদেহ  ময়দানের গাছের ডালে ঝুলিয়ে রাখা হয়েছিল যেন আর কেউ  ভারতবর্ষে স্বাধীনতার স্বপ্ন না দেখে।

 

পরে, সিপাহী বিদ্রোহের শতবর্ষ উপলক্ষে (১৯৫৭) এখানে নির্মাণ করা হয় একটি স্মৃতিসৌধ, এবং পার্কটির নাম রাখা হয় সম্রাট বাহাদুর শাহ জাফর পার্ক। ‘ঢাকা ইমপ্রুভমেন্ট ট্রাস্ট’ (ডিআইটি) এর উদ্যোগে এখানে ওই স্মৃতিসৌধটি নির্মাণ করা হয়।

 

চার স্তম্ভের ওপর গম্বুজওয়ালা স্থাপনাটিই আজকের বাহাদুর শাহ পার্কের প্রতীক। ওইসময় সিপাহি বিদ্রোহের নেতৃত্ব দিয়েছিলেন ভারত উপমহাদেশের শেষ মুঘল সম্রাট দ্বিতীয় বাহাদুর শাহ। তাঁর নামে পার্কটির নামকরণ করা হয় বাহাদুর শাহ পার্ক। আজও পার্কে বিদ্রোহীদের স্মরণে নির্মিত সেই স্মৃতিসৌধ ও রানি ভিক্টোরিয়ার স্মারক ওবেলিস্ক চোখে পড়ে।


তবে বর্তমানে পার্কের  বেহাল অবস্থায় ম্লান হতে চলেছে পুর্বের সব গৌরব আর স্মৃতিগুলো। সবচেয়ে বিস্ময়কর হলো- পার্কের ভেতরে ইতিহাস ও ঐতিহ্য সম্পর্কিত কোনো তথ্য বা লেখা নেই। এটি জাতি হিসেবে আমাদের জন্য এক বড় লজ্জার বিষয়, কারণ আমরা আমাদের ঐতিহাসিক স্মৃতি ভুলে যাই। ইতিহাস ও ঐতিহ্য সংরক্ষণ না করলে, আগামী প্রজন্ম আমাদের ভুলে যাবে। পশ্চিমা বিশ্ব এই বিষয়টি ভালোভাবে বোঝে; তারা তাদের ইতিহাস ও ঐতিহ্যকে সোনালী অক্ষরে সংরক্ষণ করে রেখে গেছে, যেন তা চিরকাল জীবিত থাকে।

 

পার্কের ভৌগোলিক ও সামাজিক প্রেক্ষাপট: পার্কটির পাশে অবস্থিত জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়, ঢাকার অন্যতম প্রাচীন শিক্ষাঙ্গন। সংলগ্ন রয়েছে ইসলামপুর বাজার, যা বাংলাদেশের কাপড় ব্যবসায়ীদের অন্যতম বৃহৎ কেন্দ্র। এখান থেকে সারা দেশে পাইকারী ও খুচরা পণ্য ছড়িয়ে যায়। বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়াশোনার সুবিধা কিংবা কাপড় কেনার প্রয়োজনে ইসলামপুর এলাকায় আসা হয় প্রায়ই। সেই সময় পার্কটির দিকে তাকালে বারবার মনে পড়ে যায় সেই ভয়ংকর দৃশ্যের কথা—যেখানে একসময় স্বাধীনতার স্বপ্ন দেখা সাধারণ সৈনিকদের লাশ ঝুলেছিল গাছের ডালে।

 

সিপাহী বিদ্রোহের ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট ও আলেমদের ভূমিকা: ১৮৫৭ সালের সিপাহী বিদ্রোহ বা ভারতের প্রথম স্বাধীনতা যুদ্ধ, ব্রিটিশ শাসনের বিরুদ্ধে ভারতীয় সৈন্য ও সাধারণ মানুষের প্রথম বৃহৎ প্রতিরোধ। মীরাট, দিল্লি, লখনউ, কানপুরসহ দেশব্যাপী এই বিদ্রোহ ছড়িয়ে পড়ে। ঢাকাও এর প্রভাবের বাইরে ছিল না। সিপাহী বিদ্রোহে অনেক আলেম ওলামা নেতৃত্ব দিয়েছিলেন, যেমন সৈয়দ ফতেহ আলী ওয়াইসি, মাওলানা কারামত আলী জৈনপুরী, এবং দারুল উলম দেওবন্দের পূর্বসূরি শিক্ষাবিদরা। এরা শুধু ধর্মীয় নেতা নয়, বরং স্বাধীনতা আন্দোলনের নীরব সৈনিক হিসেবে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছিলেন।

 

বর্তমান প্রজন্ম ও ইতিহাসের সংরক্ষণ:আজকের দিনে পার্কটি মানুষকে আনন্দ দেয়, কিন্তু ইতিহাসকে মনে করিয়ে দেয় না। এটি আমাদের শেখায়—যতই আমরা অবসর কাটাই বা বিনোদন উপভোগ করি, ইতিহাস ও ঐতিহ্যকে ভুলে গেলে আমরা আমাদের মূল পরিচয় হারাই। পার্কের প্রতিটি গাছ, প্রতিটি পদক্ষেপ, প্রতিটি ছায়া যেন সেই নিঃশব্দ আর্তনাদ শুনিয়ে দেয়—যেখানে স্বপ্ন দেখা সৈনিকরা আমাদের জন্য জীবন উৎসর্গ করেছিল। ইতিহাস সংরক্ষণ করা আমাদের দায়িত্ব, না হলে ভবিষ্যত প্রজন্মও আমাদের ভুলে যাবে।
সম্রাট বাহাদুর শাহ জাফর পার্ক শুধু বিনোদনের স্থান নয়; এটি এক নিঃশব্দ ইতিহাসগ্রন্থ, যেখানে মানুষের সাহস, আত্মত্যাগ এবং স্বপ্নের গাথা লেখা আছে। আমাদের উচিত পার্কটি শুধুমাত্র ঘুরতে বা খেলার জায়গা হিসেবে না দেখে, ইতিহাস, ঐতিহ্য ও ন্যায়ের শিক্ষণ হিসেবে গ্রহণ করা। কারণ ইতিহাসকে স্মরণ না করা মানে আমরা আমাদের নিজস্ব পরিচয় ও জাতির গৌরবকে ভুলে যাই।

 

এই পার্কের প্রতিটি পদক্ষেপ, ছায়া এবং গাছ আমাদের শেখায়—যে ইতিহাসকে আমরা ভুলে যাই, সেটিই আমাদের ভবিষ্যৎকে প্রভাবিত করবে। তাই আমাদের দায়িত্ব, এই স্মৃতি, ঐতিহ্য এবং মুক্তির শিক্ষণকে সংরক্ষণ করা, যেন ভবিষ্যৎ প্রজন্মও জানে—স্বাধীনতার জন্য মানুষের সাহস ও আত্মত্যাগের মূল্য কখনো ম্লান হয় না।


লেখক: কলামিস্ট ও গবেষক।

নয়াশতাব্দী/ইআর