সিনেমার পরিবেশক, অভিনেতা ও ফেস্টিভ্যাল ডিরেক্টর; তিন পরিচয়েই সমান স্বাচ্ছন্দ্য তার। বাংলাদেশ থেকে কোরিয়া, শ্রমিক থেকে আন্তর্জাতিক ফেস্টিভ্যাল ডিরেক্টর; এই অসাধারণ পথচলার নায়ক মাহবুব আলম। কোরিয়ায় তিনি ‘লী’ বা ‘মাহবুব লী’ নামেই পরিচিত। বর্তমানে সিউলে বসবাস করলেও, তাঁর মন সবসময় পড়ে থাকে বাংলার সিনেমায়। বাংলা চলচ্চিত্রকে নতুন দিগন্তের দিকে এগিয়ে নিতে চাওয়া এই সিনেমার দূতের সাথে আলাপচারিতায়- নিশক তারেক আজিজ
কোরিয়ায় আপনার চলচ্চিত্র যাত্রা কীভাবে শুরু?
গ্র্যাজুয়েশন শেষে ১৯৯৯ সালে প্রবাসী শ্রমিক হিসেবেই কোরিয়ায় আসি। প্রথমদিকে কাজের পাশাপাশি প্রবাসীদের অধিকার আদায়, উন্নয়ন ও সামাজিক কর্মকাণ্ডে যুক্ত হই। এই কাজ করতে গিয়েই বিভিন্ন মিডিয়ার সঙ্গে যোগাযোগ বাড়তে থাকে। এরপর প্রামাণ্যচিত্র, টকশো এবং নানা ধরনের কন্টেন্টে কাজ শুরু করি। এভাবেই শ্রমিকদের পক্ষে কথা বলতে গিয়ে শর্ট ফিল্ম ও ডকুমেন্টারিতে অভিনয়ের সুযোগ আসে।
অভিনয়ের প্রতি আগ্রহ কি শুরু থেকেই ছিল?
শৈশব থেকেই অভিনয়ের প্রতি আগ্রহ ছিল। এফডিসিতে ছোটখাটো অভিনয়ও করেছি। কিন্তু বাস্তবতায় দেশের বাইরে পাড়ি জমাতে হয়। প্রবাসজীবনে কাজ করতে করতেই সুযোগ আসে বিভিন্ন শর্টফিল্ম, নাটক এবং পরবর্তীতে বড়পর্দার চলচ্চিত্রে। কোরিয়ান পরিচালক সিন্দোং ইল-এর ‘বান্ধবী’ সিনেমায় করিম নামের একটি বড় চরিত্রে অভিনয় করার সুযোগ পাই। এটা আমার অভিনয়জীবনের গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায় বলা যায়।
বর্তমানে আপনি পরিবেশনাতেও যুক্ত। কীভাবে এই কাজ শুরু?
সিনেমা ভালোবাসি। তাই নিজের ডিস্ট্রিবিউশন কোম্পানি দিয়ে বছরে ১০–১২টি সিনেমা নিয়মিতই কোরিয়ার থিয়েটারে কমার্শিয়ালি রিলিজ করি। অনলাইন প্ল্যাটফর্মে প্রতি সপ্তাহে অন্তত একটি সিনেমা অনএয়ার করি। পাশাপাশি আমি পরিচালনা করছি ‘সিউল আর্ট হাউজ ফিল্ম ফেস্টিভ্যাল’ এর, যার উদ্যোক্তাও আমি নিজেই। সিনেমা সম্পর্কিত কাজ নিয়েই প্রায় সারা বছর বিভিন্ন আন্তর্জাতিক মার্কেট ও ফেস্টিভ্যালে যেতে হয়।
বাংলাদেশের সিনেমা নিয়ে আপনার মতামত কি?
বাংলাদেশের সিনেমা চলে না, এটা ভুল কথা। আসলে ভালো প্রোগ্রামার নেই, টার্গেট অডিয়েন্স বুঝতে পারে এমন লোক নেই। মানুষ সিনেমা দেখে না নয়, মানুষকে সিনেমা দেখানো হয় না।
ছোট ছোট হল বাড়াতে হবে। পাশাপাশি বড় বড় মাল্টিপ্লেক্স করতে হবে। আন্তর্জাতিক সিনেমা দেখার সুযোগ তৈরি করতে হবে এবং সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ, সেন্সরশিপ থেকে বের হয়ে আসতে হবে।
আপনি নারায়ণগঞ্জে সিনেমা হল করতে চাচ্ছেন?
হ্যাঁ, নারায়ণগঞ্জে একটা মাল্টিপ্লেক্স টাইপ সিনেমা হল করতে চাই। শুধু সিনেমার টিকিট বিক্রি করে হলে লাভ করা সম্ভব না। তাই রেস্টুরেন্ট বা কফিশপ থাকতে হবে; যা সিনেমা হলের ঘাটতি পূরণ করবে। এখন সংশ্লিষ্ট মহলের সাথে কথা বলছি।
ডাবিং বনাম সাবটাইটেল; আপনার অবস্থান কি?
আমি ডাবিংয়ের বিপক্ষে। সাবটাইটেল দেওয়া যেতে পারে, তবে ডাবিং করলে সিনেমার আসল আবহ হারিয়ে যায়। সাবটাইটেল না থাকলে বিদেশি ভালো সিনেমা দেখানোই সম্ভব নয়। তাই বাংলাদেশে সাবটাইটেলের অভ্যাস গড়ে তোলাটা জরুরি।
বাংলাদেশের সিনেমা ব্যবসায় লস হওয়ার কারণ কি?
বাংলাদেশে সিনেমায় কেউ লগ্নি করে না, কারণ বাজার ছোট। লস হওয়ার ভয় থাকে। পরিচালক একা চেষ্টা করলে হবে না; সেলস, ডিস্ট্রিবিউশন, মার্কেটিং সবকিছুতে সমন্বয় দরকার।
কোরিয়াতে যেমন হয়, স্ক্রিপ্টের সময়েই সিনেমা গ্লোবালি বিক্রি হয়ে যায়। তাই তাঁদের সিনেমায় লস হয় না। আমাদেরও আন্তর্জাতিক বাজার ধরতে হবে। দূতাবাসগুলোতে স্ক্রিনিং করতে হবে, বিদেশি ফেস্টিভ্যালে জায়গা করে নিতে হবে।
ভবিষ্যতে আপনার লক্ষ্য কি?
বাংলা সিনেমাকে আন্তর্জাতিক বাজারে পৌঁছে দিতে চাই। পরিবেশনা বা প্রযোজনা যেভাবেই হোক; ভালো স্ক্রিপ্ট পেলে আমি কাজ করতে চাই। কোরিয়ায় কিংবা অন্য কোনো দেশে বাংলা সিনেমার প্রদর্শনী বাড়াতে চাই। কারণ আন্তর্জাতিক দুনিয়ায় আমাদের সিনেমার প্রচারণা এখনো খুব কম।
আপনি বাংলা সিনেমার ভবিষ্যৎ কীভাবে দেখেন?
বাংলা সিনেমার সম্ভাবনা বিশাল। শুধু সঠিক পরিকল্পনা, সঠিক বাজার আর সঠিক প্রচারণা দরকার। আমাদের গল্পে কনফিডেন্স রাখতে হবে, নিজেদের স্বকীয়তা ফিরিয়ে আনতে হবে। বাজার বড় করতে পারলে, বাংলা সিনেমাও আন্তর্জাতিক মানের জায়গায় পৌঁছাবে বলে আমি বিশ্বাস করি।